.ডাকবক্সের প্রেম।
.
-Shaidur Rahnan Siddik
.
আজও সেই খামের ভিতরের চিঠিটা তেমন আছে। কিন্তুু খামটা আর চিঠির খাম বলে মনে হচ্ছে না।উপরে ধুলা ময়লা দিয়ে ভরা একটা অকার্যকর পরিত্যাক্ত কাগজ বলেই সবাই মনে করবে। হুহ্ হতভাগার কপালটাই খারাপ বলেই জীবনের চাওয়াটুকু এমন ভাবেই ধুলোয় মিশে গেল...!
.
গিতালদাহ রেল ইস্টেশনে যখন আমি ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করতেছি আর শীতের একটি মিষ্টি সকালে পাশের ছোট চায়ের দোকানে এক কাপ গরম চায়ের কাপে হাল্কা হাল্কা চুমুক দিচ্ছিলাম। ঠিক তখনেই মেয়েটি কোথা থেকে জানি চলো আসলো।
.
আমি একটু নির্বাক চোঁখে তাকিয়ে রয়ে গেলাম তার দিকে,যেমনটা তাকিয়ে কেউ রয় অবাক কিছু নজরে চলে আসলে। আমি সেই মিষ্টি সকালে তার দিকে নজর দিয়ে আবারও কিসের যেন মিষ্টতা অনুভব করতে লাগলাম।
.
ইতি মধ্যেই ট্রেন হুইসেল দিতে দিতে ইস্টেশনে চলে আসলো, আমি চশমাটা পড়ে ব্যাগটা কাধে নিয়ে প্রথম সারীর একটি আসন গ্রহন করলাম। ঝক ঝক করে ট্রেনটি গৌরপুরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিতে শুরু করলো।
.
কবি মানুষ হিসেবে আমার বেশ সৌখিনতা, তাই কাধের ঝোলা থেকে ডায়েরী আর বলপেন বের করে ট্রেনের জানালা দিয়ে মিষ্টি সকাল নিয়ে কিছু আবৃতি কষতে লাগলাম, সাথে সেই মেয়েটির টপিক নিয়ে লেখতেও ভুল করলাম না।
.
কলম মুখে দেওয়া আমার পুড়োনো বদঅভ্যাস, একবার কষতেছি আর একটু করে কলমটা মুখে দিয়ে ভাবতেছি, আমি আমার মাথার উপর কখনই তাকিয়ে দেখিনি,হঠাৎ কে যেন ডাক দিল মহাশয়..........
.
আমি মাথা উঁচু করে তাকিয়ে বললামঃ জ্বী কিছু বলবেন...?
.
নীলাঃ আপনি বোধহয় কবিতা আবৃতি করছেন, আমি এতক্ষণ পড়লাম খুব সুন্দর করে কষেছেন।
.
-জ্বী, আমি কবিতা কষতেছি, জানি না কেমন হবে।
.
নীলাঃ খুব সুন্দর হয়েছে।
.
-ধন্যবাদ, আপনি মনে কিছু না করলে আমার পাশের চেয়াটিতে বসতে পারেন, দাড়িয়ে থাকা একদম ঠিক হয়নি, কোথায় যাবেন আপনি...??
.
নীলাঃ জ্বী, আমি গৌরপুর যাবো, সেখানেই একটা কলেজে লেখাপড়া করি।
.
-ওহ্ তাহলে ভালই হলো, আমিও একটা প্রোগ্রামে গৌরপুরে যাচ্ছি, বসুন গল্প করতে করতে চলি।
.
নীলাঃ জ্বী, অবশ্যই, অনেক ভালো লাগলো।
.
ট্রেন চলছে নীলা আর আমি একই পথের যাত্রী তাও আবার পাশাপাশি চেয়ারে বসে আছি। আমার প্রথম প্রথম বিশ্বাসেই হচ্ছিল না। মনে হচ্ছিল আজও আমি কিছু একটা স্বপ্নকে নিয়ে প্রেম গল্প লেখা নিয়ে ব্যস্ত। কিন্তুু না আজ আমার গল্প কেন জানি নিজের দিয়ে বাস্তব।
.
নীলার চুলগুলো বাতাসে দুলছে, কি অপরুপ দেখতে তার চুলগুলো। হাসিটাও অনেক সুন্দর, কথা বার্তা ব্যবহার সব কিছুই একটা ভাল চরিত্রের মেয়ের মতো। কথাও হলো অনেক তার সাথে। জীবনের নানা সময়ের সব বিষয়েই আপনের মত করে। সেদিনেই আমি তার প্রেমে পড়ে গেলা।
.
ইতিমধ্যেই ট্রেন গৌরপুরের কাছা-কাছি চলে এসেছে। দুজনেরেই মন খারাপ, কেন জানি সব শূণ্য শূণ্য মনে হতে লাগলো। যাবার সময় নীলা আমাকে তার বাড়ীর ঠিকানা ও কলেজের ঠিকানাটা হাতে ধরিয়ে দিলো, এবং একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে আস্তে করে বলে দিল........ একটি নীল চিরকুটের অপেক্ষায় থাকলাম।
.
আমি নিশ্চুপ হয়ে দাড়িয়ে থাকতে বাধ্য হলাম, আর ভাবতে লাগলাম নীলা একদম মনের কথাটা সরাসরি বলে দেওয়াটা বোধ হয় ঠিক হবে, কিন্তুু গলার মধ্যে কথাটা আটকিয়ে গেল। ইতি মধ্যেই নীলা আমার হতে অনেক দুরেই চলে গিয়েছে ।
.
প্রোগ্রাম শেষ করে আমি বাসায় এসে একটি নীল চিরকুটে লিখে দিলাম.......................
.
প্রিয়,নীলা..
.
''আশাকরি ভালই আছো, আমিও তেমন ভালো আছি যেমন একটি সদ্য ফুটন্ত গোলাপ নিস্পাপ থেকে থাকে, ঠিক তেমনেই তোমার ভালবাসা নিয়ে তেমন ভালো আছি। আমার সেই ভালসার একটি পাপড়ীর শুভেচ্ছা নিও।
.
আমি জানি তুমি আসাকে ভালবেসেছিলে, কিন্তুু লিখতে সেদিন তোমার বুক ফেটেছিল মুখ ফাটে নি। আমিও তোমাকে অনেক ভালবাসি, আমিও তেমন করে তোমাকে কিছুই বলতে পারি নি ।
.
আজ তোমার কথা মত লীল চিরকুটের মাঝেই লিখে দিলাম আমি তোমাকে ভালবাসি,ভালবাসি, ভালবাসি।
.
আমি চিরদিনের জন্য তোমার উত্তরের অপেক্ষায় রইলাম, আশা করি খুব তারাতারি উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করবে''।
.
............ চিরকুট টি আমি ডাকবক্স এ রেজেস্ট্রারি ছাড়াই নীলার কাছে প্রেরণ করিলাম, আর মনে মনে নীলাকে নিয়ে ভাবতে শুরু করলাম।
.
ডাকমাষ্টার সেদিন চিঠিটা ঠিকেই নিয়েছিল বোধহয়, হয়তো কোন এক ভুলে ফেলে রেখে গিয়েছিল কোন এক টেবিলের তলে। জানি না কেন এমন হয়ে গেছে নীলার আর আমার প্রেমের গল্পটি।
.
ভেবেছিলাম হয়তো নীলা চিঠিটা ঠিকেই পেয়েছে কিন্তুু উত্তর দিচ্ছে না কেন,সেই ভাবনায় মনটা ছটফট করতে লাগল।
এভাবেই কেটে গেল প্রায় ৫ টি বছর। বিএ পাশ করে আমি চাকুরি খোজার জন্য ব্যস্ত।
.
চাকুরিটা পেয়েই গেলাম, একটা ডাক মাষ্টার হিসেবেই, নতুন জয়েন দিলাম প্রথম অফিসেই।
.
আগের সব ফাইল হাতিয়ে দেখলাম ঠিক আছে কিনা, সারাদিন নতুন অফিসে সব দেখে দেখতে দেখতে দিনের প্রায় অর্ধেক শেষ,...... হঠাৎ একটি কোণায় খুব ময়লা ও পুড়োনো খাম দেখে কৌতুহল করে উঠলাম।
.
ইতি মধ্যেই আমার শরীর দিয়ে ঘাম ঝড়তে শুরু করে দিয়েছে, দেখেই আমি আর অশ্রু ধরে থাকতে পারলাম না..........!!
.
এই চিঠিটা আমি ৫ বছর আগে নীলাকে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম, আমি এতদিন নীলাকে মনে মনে অনেক বকা দিয়ে এসেছি চিঠির উত্তর না পাওয়ার কারনে। হয়তো নীলাও আমাকে তেমনী করে অনেক বকা দিয়েছে ।
.
বিজয় সেখানেই আর একটা বড় নিঃশাস নিয়ে চোঁখের জল ফেলতে লাগলো আর মুখ দিয়ে কিছু একটা বলতে লাগলো, কিন্তুু কিছুতেই বলতে পারছে না।
.
সেই ছোট বেলা থেকে বিজয়ের স্বপ্ন একে গল্প কষাটা, আজ বাস্তবে অসমাপ্ত ভালবাসা গল্প হিসেবে রচনা হয়ে থাকলো, তখন বিজয় মনে মনে ভাবতে লাগলো হয়তো নীলা আমার চিঠির জন্য আজও অপেক্ষায় আছে, আর এ দিকে আমি তার চিঠির জন্য অপেক্ষায় রয়ে ছিলাম ।
.
আমার জন্য শুধু এই গল্পটা অসমাপ্ত ভালবাসা হিসেবে রয়ে গেল, জানি না নীলা কি অনুভবেই না আছে।
#নষ্ট
Post a Comment