সব খবরঃ
বগুড়ায় এক ভয়ংকর নাম তুফান সরকার। ক্ষমতার বলয়ে তাদের পরিবার বলে টু শব্দটি করার জো নেই তাদের বিরুদ্ধে। বড় ভাই বগুড়া শহর যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মতিন সরকার। স্ত্রীর বড় বোন স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর।
তুফানের উত্থান আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর। প্রথমদিকে তেমন আলোচনায় না থাকলেও মাদক ব্যবসায় তার পরিবার জড়িত কয়েক দশক ধরেই। সেই সুযোগটাকে কাজে লাগাতে ২০১৫ সালে শহর শ্রমিক লীগে যোগ দেয় সে। এরপর সংশ্লিষ্টদের ম্যানেজ করে প্রশাসনের নাকের ডগায় মাত্র দুই বছরেই কোটিপতি হয়ে যায় তুফান ও তার পরিবার।
শহরের চকসূত্রাপুর এলাকায় আলিশান বাসা তাঁর। শহরের চকযাদু ক্রস লেন সড়কে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। অস্ত্রধারী ক্যাডার নিয়ে চলাফেরা করেন। এত কিছুর পরও ক্ষমতাসীন দলের জেলার শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে সখ্যের কারণে শ্রমিক লীগের পদ-পদবি বাগিয়েছেন তিনি। কিছুদিন আগেও শহর শ্রমিক লীগের সহসভাপতি ছিলেন। নেতাদের আশীর্বাদে কিছুদিন আগে কমিটির আহ্বায়কের পদ পান তিনি।
সম্প্রতি শহরের চকযাদু সড়কে তাঁর নতুন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান উদ্বোধন করেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মমতাজ উদ্দিন। যোগাযোগ করা হলে তুফান সরকারকে নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি মমতাজ উদ্দিন।
বগুড়া শহর শ্রমিক লীগের আহ্বায়ক ও কিশোরী ছাত্রী ধর্ষণের হোতা তুফান শাসক দলের শ্রমিক সংগঠন শহর শ্রমিক লীগের আহ্বায়কের পদকে হাতিয়ার করে নিজের নামে গড়ে তুলেছেন ‘তুফান বাহিনী’।
পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজি থেকে শুরু করে মাদক ব্যবসা, দখলবাজি ও বাণিজ্যমেলায় জুয়ার আসর বসিয়ে টাকা কামিয়েছেন দুই হাতে। তিনি এখন কোটি কোটি টাকার মালিক। বাবা মজিবর রহমান রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করলেও তার ছেলে তুফান থাকেন বিলাসবহুল বাড়িতে, চড়েন দামি গাড়িতে।
বগুড়ায় এক কিশোরীকে ধর্ষণ ও মাসহ তার মাথা ন্যাড়া করে দেওয়ার ঘটনায় শুক্রবার (২৮ জুলাই) গ্রেফতার হওয়ার আগে বগুড়া শহরের মানুষ তুফান সরকারকে চিনতো ‘শহরের ত্রাস’ হিসেবে। রোববার জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন তাঁর। এ ঘটনা তোলপাড় পড়ে যাওয়ায় সংগঠন থেকে তাঁকে বহিষ্কারও করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বগুড়া শহরের চকসুত্রাপুর কসাইপাড়া এলাকার ক্ষুদে ব্যবসায়ী মজিবর রহমান সরকারের আট ছেলের মধ্যে সবার ছোট তুফান সরকার। ২৪ বছর বয়সী তুফান পারিবারিকভাবে চমড়া ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হলেও ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তার বড় ভাই যুবলীগ নেতা মতিন সরকারের মাধ্যমে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন।
বড় ভাই আব্দুল মতিন বগুড়া শহর যুবলীগের যুগ্মসম্পাদক হওয়ায় রাজনীতিতে তুফান সরকারের দ্রুত উত্থান ঘটে। এক সময় তিনি মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন। ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে তিনি একটি বাহিনীও গড়ে তোলেন। মাদকের টাকায় তিনি দ্রুত ‘আঙুল ফুলে কলাগাছ’ বনে যান।
২০১২ সালের ৪ এপ্রিল তুফানকে ইয়াবা ও ফেন্সিডিলসহ গ্রেফতার করে পুলিশ। পরে তিনি জামিনে বেড়িয়ে আসেন। একই বছরের ২০ জুলাই একটি হত্যা চেষ্টা মামলায় তুফান এবং তার তিন ভাই ঝুমুর, ওমর ও সোহাগ গ্রেফতার হয়। তবে কোনো বারই তাদের বেশি দিন জেলে কাটাতে হয়নি।
ফলে তুফানের বেগেই যাবতীয় কুকর্ম অব্যাহত রাখেন তুফান সরকার। পরের বছর অর্থাৎ ২০১৩ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ইমরান হোসেন নামে প্রতিবেশী এক যুবদল নেতা খুন হন। ইমরানের মা তার ছেলে হত্যাকাণ্ডে তুফান ও তার ভাইদের জড়িত থাকার অভিযোগ করেন।
ইমরানের মা তখন সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করেন, মতিন এবং তার ভাইদের নেতৃত্বে সন্ত্রাসীরা তার ছেলেকে হত্যা করেছে। তিনি বলেন, ‘একই সন্ত্রাসীরা খোকন নামে তার আরো এক ছেলেকে হত্যার চেষ্টা চালায়। ওই ঘটনায় থানায় মামলা দিতে গেলে পুলিশ নেয়নি।’
আক্ষেপ করে ইমরানের মা বলেন, ‘পুলিশ কখনোই এই সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয় না। যদি নিত তাহলে ইমরানকে মরতে হতো না।’
একাধিক মামলার আসামি তুফান সরকার এক সময় জাতীয় শ্রমিক লীগে যোগদান করেন। তাকে ওই সংগঠনের বগুড়া শহর শাখার দায়িত্ব দেওয়া হয়। এরপর তিনি সংগঠনের ওই পদবি ব্যবহার করে শহরে ব্যাটারিচালিত তিন চাকার রিকশা-ভ্যান মালিক সমিতির নেতৃত্ব নেন। প্রতিটি রিকশা মালিককে সমিতিতে ভর্তি বাধ্যতামূলক করে তাদের কাছ থেকে ভর্তি ফি বাবদ এক বছরের জন্য ২০ হাজার টাকা করে আদায় করেন। সেই হিসাবে বগুড়া শহরে চলাচলকারী ১০ হাজার রিকশা-ভ্যান থেকে এক বছরেই আয় হয় ২০ কোটি টাকা।
এছাড়া সমিতির প্রতিটি রিকশা-ভ্যান থেকে তার সমিতির নামে ২০ টাকা করে প্রতিদিন ২ লাখ টাকা করে বছরে আরো ২৪ লাখ টাকা আদায় করা হয়। ভর্তি এবং চাঁদার নামে তোলা এই অর্থের ভাগ আজ পর্যন্ত কোনো রিকশা-ভ্যান মালিককে দেওয়া হয়নি। বরং চাঁদাবাজির পুরো টাকা তুফান ও তার সহযোগীরাই ভাগ-বাটোয়ারা করে নেন। পরে সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের নজরে এলে তার নির্দেশের পর তুফান বাহিনী বগুড়ার ব্যাটারি রিকশা থেকে চাঁদাবাজি বন্ধ করে।
সম্প্রতি তিনি নিজ এলাকায় প্রাসাদতুল্য বাড়ি নির্মাণ করেছেন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ‘তুফান বাহিনী’র প্রধান তুফানের বিরুদ্ধে শহরের বিভিন্ন স্থানে জায়গা-জমি এবং দোকান-পাট দখলেরও বহু অভিযোগ রয়েছে। প্রায় ৩ মাস আগে তিনি ক্যাডার বাহিনী নিয়ে শহরের তালুকদার মার্কেটে জনৈক রাজা মিয়া নামে এক ব্যক্তির দোকান দখল করে এক ব্যক্তিকে সেখানে বসিয়ে দেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেলা শ্রমিক লীগের একজন নেতা জানান, তুফান সরকার ২০১৫ সালে শহরের চকসূত্রাপুর এলাকায় বাণিজ্য মেলায় নামে প্রায় দেড় বছর জুয়ার আসর পরিচালনা করে। এখানে কয়েক কোটি টাকা আদায় করে সে। তার বিরুদ্ধে চোরাই গাড়ি কেনাবেচার অভিযোগ রয়েছে। দলের নাম ও পদ ভাঙিয়ে প্রায় দু’বছর বগুড়া শহরে অন্তত ১০ হাজার ব্যাটারিচালিত ইজি বাইকে চাঁদাবাজি করেছে তুফান। তার স্টিকার ছাড়া বগুড়া শহরে কোনও রিকশা চলতো না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক এলাকাবাসী জানান, তুফান ও তার পরিবারের অনেক সদস্যের মাদক ব্যবসা সম্পর্কে সবাই জানেন। তারা মাদক ব্যবসায়ী পরিবার ছাড়া সন্তানদের বিয়ে দেন না বগুড়ায় এটাও সবার মুখে মুখে প্রচারিত। এমন দেখা গেছে, কিছুদিন আগে যারা মানুষের কাছে হাত পেতে চেয়ে খেতেন, তুফানদের সঙ্গে আত্মীয়তার সুবাধে তারা এখন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে ঘুমান।
উল্লেখ্য, বগুড়ায় ভালো কলেজে ভর্তির প্রলোভনদেখিয়ে গত ১৭ জুলাই এক কিশোরীকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে ধর্ষণ করেন শ্রমিক লীগ বগুড়া শহর শাখার তৎকালীন আহ্বায়ক তুফান সরকার। এর ১০ দিন পর তুফান সরকারের স্ত্রী আশা ও তার বড় বোন বগুড়া পৌরসভার সংরক্ষিত নারী ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মার্জিয়া হাসান রুমকির নেতৃত্বে ‘একদল সন্ত্রাসী’ মেয়েটি ও তার মাকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায়। পরে শহরের চকসূত্রাপুর এলাকায় কাউন্সিলর রুমকির বাড়িতে মা ও মেয়ের মাথা ন্যাড়া করে বেধড়ক পেটানো হয়। ধর্ষণের শিকার মেয়েটি এবার বগুড়া শহরের একটি বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে।
ধর্ষণ ও নির্যাতনের ঘটনায় ওই কিশোরীর মা বাদী হয়ে গত ২৮ জুলাই রাতে বগুড়া সদর থানায় ১০ জনের বিরুদ্ধে দুটি মামলা করেন। এরপর রাতেই তুফান এবং আতিকুর রহমান আতিক, আলী আজম দিপু ও রূপম নামের তার তিন সহযোগীকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
মামলার প্রধান আসামি তুফান এবং তার দুই সহযোগী দিপু ও রূপমকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রোববার তিন দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছে আদালত। তুফানের দেহরক্ষী হিসেবে পরিচিত আতিকুর রহমান আতিক ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে শনিবার রাতে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
এদিকে রবিবার (৩০ জুলাই) রাতে সাভারের হেমায়েতপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে তুফান সরকারের স্ত্রী পলাতক আশা সরকার, তুফানের সহযোগী মুন্না, তুফানের গাড়িচালক জিতু কে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর আগে বগুড়া গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একটি দল রোববার সন্ধ্যায় পাবনা শহর থেকে তুফানের স্ত্রী আশা খাতুনের বড় বোন রুমকি ও তুফানের শাশুড়ি রুমা খাতুনকে গ্রেপ্তার করে।
এদিকে ঘটনার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে তুফান সরকারকে শ্রমিক লীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
Post a Comment